সিলেট সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে আসছে কারা?

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

১৩ জুলা ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ণ


সিলেট সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে আসছে কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেট বিভাগের ভূ-প্রকৃতি পাহাড়-টিলা-সমতল ও হাওড় অধ্যুষিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই জনপদের তিন দিকেই ভারত সীমান্ত। আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় এই তিন রাজ্যেই উগ্রবাদীদের তৎপরতা বেশি। প্রতিটি উগ্রবাদী সংগঠনই অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। হাত বদল হয়ে তাদের অস্ত্র-বিস্ফোরক অহরহ ঢুকছে সিলেট সীমান্ত দিয়ে। অতীতের সব অস্ত্র-বিস্ফোরক চালান আটক ও বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জবানিতে এমন তথ্য বারবার উঠে এসেছে। এছাড়া বিগত সরকারের সশস্ত্র ক্যাডারদের অস্ত্রের মহড়া, জুলাই আন্দোলনে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি ও থানাসহ পুলিশ প্রশাসনের অস্ত্র লুটের পর চরম ঝুঁকিতে সিলেট অঞ্চল। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই চোরাচালান আরও বেড়েছে।

জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও সুনামগঞ্জের সীমান্তপথ দিয়ে প্রায় সময়ই অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, ভারতীয় ‘আমিন এক্সপ্লোসিভ প্রাইভেট লিমিটেড’ কোম্পানিতে তৈরি নিওজেল-৯০ বিস্ফোরক, ডেটোনেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চোরাইপথে ঢুকছে বাংলাদেশে। এরমধ্যে চোরাই পথে আসা বিস্ফোরকের মধ্যে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পাথরখনিতে ব্যবহৃত পাওয়ার জেল-৯০’, ‘ইলেকট্রিক ও নন-ইলেকট্রিক ডেটোনেটর’ বেশি। । গত কয়েক মাসে বিস্ফোরকের এমন অন্তত ১৩টি চালান আটক করেছে বিজিবি ও র‌্যাব। এ ছাড়া চলতি বছরের ছয় মাসে ১৪৬টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক, ১ কেজি ১২৫ গ্রাম বিস্ফোরক এবং ১৮৩টি ডেটোনেটর জব্দ করে।

সুত্র জানায়, গত মাসে জকিগঞ্জের বারোঠাকুরী ইউনিয়নের সোনাসার এলাকার একটি ইটভাটায় অভিযান চালানো হয়, যা জিরো লাইন বা সীমান্তরেখা থেকে বাংলাদেশের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। সেখান থেকে ১১টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক, ১১টি ডেটোনেটর ও একটি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে মৌলভীবাজারের বড়লেখা সীমান্ত পিলারের ১৩৮৫/এম-এর আনুমানিক ৫০০ গজ ভেতরে দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের তারাদরম এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি বিদেশি পিস্তল, তিন কেজি বিস্ফোরক, ২৪টি ডেটোনেটর, ধাতব তার এবং দুটি ধারালো চাপাতি উদ্ধার করা হয়। ওই এলাকা থেকেই গত ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ২৪টি বিস্ফোরক, ২৩টি ডেটোনেটর ও তিনটি পাইপগান উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া গত ১৮ জুন রাতে গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর কানিশাইল এলাকার একটি ঝোপ থেকে একটি দেশীয় ওয়ান শুটারগান, ছয়টি জেল, আটটি ডেটোনেটর এবং থানা থেকে লুট হওয়া দুটি টিয়ারশেল উদ্ধার করে র‌্যাব-৯।

এদিকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের কাজলসার ইউনিয়নের রায়গঞ্জ এলাকায় ১৫টি পাওয়ার জেল ও ১৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। কানাইঘাট উপজেলার ধর্মপুর এলাকা থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪টি বিস্ফোরক ও ১৪টি ডেটোনেটর এবং ৩০ জানুয়ারি দিঘিরপাড় ইউনিয়নের কুওরেরমাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত একটি ভবনের ভেতর থেকে, যা সীমান্ত পিলার থেকে সাড়ে ৭ কিলোমিটার ভেতরে, ২৫টি বিস্ফোরক ও ২৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়।

গোয়াইনঘাটের পশ্চিম আলীরগাঁওয়ের সাতাইন এলাকা থেকে ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আটটি বিস্ফোরক ও আটটি ডেটোনেটর এবং ১৫ জানুয়ারি জৈন্তাপুরের কাটাগাঙ এলাকা থেকে ১৪টি বিস্ফোরক ও ডেটোনেটর জব্দ করা হয়। গত ২৩ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় রেলওয়ের পুরাতন টয়লেটের ভেতর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।

সুনামগঞ্জ জেলাও এই তালিকায় পিছিয়ে নেই। সেখানে গত ২৮ জানুয়ারি রাতে তাহিরপুরের বারেকেরটিলা ওয়াচ টাওয়ারের পাশ থেকে ১ কেজি ১২৫ গ্রাম বিস্ফোরক ও ১৬টি ডেটোনেটর এবং ২৬ ডিসেম্বর চারাগাঁও সীমান্তে ২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। এর আগে ছাতকের ছনবাড়ী সীমান্ত থেকেও বিস্ফোরকসহ একটি বিদেশি রিভলভার উদ্ধার করা হয়। তবে আশঙ্কার কারণ ও রহস্যজনক বিষয় হলো, একের পর এক বিপুল পরিমাণ মারাত্মক অস্ত্র ও বিস্ফোরকের এসব চালান পরিত্যক্ত অবস্থায় ধরা পড়লেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত এর মূল হোতা বা বহনকারী চক্রের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

র‌্যাবের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে চলতি এ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৩৫ কেজি ৭৩০ গ্রাম ভারতীয় বিস্ফোরক ও ২২৪টি ডেটোনেটর উদ্ধার করেছে তারা। একই সময়ে দেশি-বিদেশি ৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড গুলি, ছয়টি ম্যাগাজিন, একটি সাউন্ড গ্রেনেড, পাঁচটি পেট্রোল বোমা, ১১টি ককটেল এবং ১৫৫টি এয়ারগান জব্দ করে র‌্যাব।

এ বিষয়ে র‌্যাব-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ (গণমাধ্যম) জানান, চোরাচালান রোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছে। এই চক্রের পেছনের অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুবায়ের আনোয়ার এবং বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের ৫২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজন সীমান্ত অভিযানগুলোর নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে, মাদক ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির গোয়েন্দা তৎপরতা ও সতর্ক অবস্থান জোরদারের কারণে মারাত্মক অস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাচালানগুলো প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 992 বার