সিলেটে ট্রিপল মার্ডার: বাদীর সন্দেহে থাকা সিরাজ জেল খেটেছেন একাধিকবার

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

১৫ আগ ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ণ


সিলেটে ট্রিপল মার্ডার: বাদীর সন্দেহে থাকা সিরাজ জেল খেটেছেন একাধিকবার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহকর্মী তাহমিনাকে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় উঠে এসেছে সিরাজুল ইসলাম নামে এক আইনজীবীর নাম।
বিশেষত নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার রাতে কোতোয়ালি থানায় জমা দেওয়া এজাহারে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

সিরাজের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। আব্দুস সাত্তার খুন হওয়ার পর থেকেই বিরোধের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। তখন থেকেই আব্দুস সাত্তারের স্বজনসহ স্থানীয় অনেকে ট্রিপল মার্ডারের সাথে এই বিরোধের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন।

এদিকে, জামায়াত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে আগেও একাধিকবার জেল খেটেছেন। নগরের রিকাবিবাজারের পুলিশ লাইন্স লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও তাদের কবরস্থানের ভূমি জালিয়াতি করে নামজারি করার অভিযোগ ও চেক ডিজঅনার মামলায় ২০২১ ও ২০২২ সালে একাধিকবার জেল খাটেন তিনি। এই জায়গা নিয়েই আব্দুস সাত্তারের সাথে দ্বন্দ্ব ছিল সিরাজের।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব।

গত বুধবার সকালে রায়নগর এলাকায় মিতালী ১১১ নম্বর বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

সিরাজের বিরুদ্ধে বাদীর যে অভিযোগ
আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যার ঘটনায় শুক্রবার রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা।

এজাহারে জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরেই তারা বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

এজাহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।

২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।

এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন তার বাবা। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম সেলিনার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে সেলিনা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

সেলিনার অভিযোগ, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তার বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সেলিনা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোন হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।

একাধিকবার জেল খাটেন সিরাজ
২০২২ সালের আগস্টে আইনজীবী ও জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলামকে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের মামলায় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এর আগে চেক ডিজঅনার ও প্রতারণা মামলায় দুইবার জেল খাটেন এই জামায়াত নেতা।

নগরীর রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন্স লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও তাদের কবরস্থানের ভূমি জালিয়াতি করে সাফকবালা দলিল সৃষ্টি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনও নামজারি করার অভিযোগে ২০২১ সালের ২৯ জুন মামলা করেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন।

মামলায় জেলা বারের সিনিয়র আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম ছাড়াও সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার, ভূমি অফিসের কানুনগো ও তহশিলদারকে আসামি করা হয়। সাবরেজিস্ট্রার সিলেট থেকে বদলি হওয়ার পর পলাতক থাকলেও মামলায় জামিনে ছিলেন সিরাজসহ অপর দুইজন। এরপর পুলিশ লাইন্স গির্জা সমিতির চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাই হুমকির অভিযোগে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন।পাশাপাশি আদালতে জামিন বাতিলেরও আবেদন করেন।

২০২২ সালের আগস্টে জামিন আবেদন শুনানি শেষে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রিকাবীবাজারের সিলেটে জেলা স্টেডিয়ামের সামনে গির্জার জায়গাও কবরস্থান দখল করে ইম্পালস টাওয়ার গড়ে তুলেন আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম। সিরাজুল ইসলাম সাক্ষী সেজে ছাফিয়া আহমদ নামের এক মহিলার নামে ৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি গির্জার ১৫ শতক জায়গা ইজারার জন্য একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেন। ওই বায়নাপত্র রেজিস্ট্রি না করে সিরাজুল ইসলাম ২০০৬ সালে ২৪ ডিসেম্বর ইজারা বলবৎ থাকাবস্থায় গির্জা সমিতির অবশিষ্ট ৮০ শতক জায়গা একটি সাফকবালা দলিল (নং ১৮৫২২/০৬) নিজে সম্পাদন করেন। এতে সংক্ষুব্ধ হন ইজারাদার ও গির্জা সমিতির লোকজন। এ নিয়ে মামলা হলে ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর আদালত ওই দলিল বাতিল করেন।

পরবর্তীতে টাওয়ারে বিনিয়োগকারীসহ গির্জা সমিতির সাথে সিরাজুল ইসলামের একাধিক মামলা হয়। পাশাপাশি গির্জা সমিতির আবেদনের প্রেক্ষিতে দুদক সিরাজুল ইসলামসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই মামলায় তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার