ইরান যুদ্ধ: কেন আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন
০১ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে নূতন করিয়া যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠিল। বেশ কয়েক মাস ধরিয়া প্রস্তুতির পর অবশেষে গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা করিয়াছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী হামলা হইয়াছে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, কোম, কারাজ ও কারমানশাহতে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন ও তাহার কার্যালয়ের নিকট ঘটিয়াছে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা। তবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লওয়া হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক এই অভিযানের নাম দেওয়া হইয়াছে ‘লায়ন’স রোয়ার’। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ ছাড়া আর কিছুই নহে।
এইবার মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে এই যুদ্ধের উত্তাপ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইহার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করিয়াও হামলা চালাইয়াছে। এই দিকে ইসরাইলকে লক্ষ্য করিয়া পালটা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়িয়াছে ইরান। ইসরাইলের পর এইবার বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়াছে। উল্লেখ্য, এই সকল দেশের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রহিয়াছে।
ইহার পূর্বে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি লইয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি মন্তব্য করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হইয়াছে। তাই আমরা আজকের দিন আলোচনা শেষ করিয়াছি।’ আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় আবার তাহাদের বসিবার কথা ছিল; কিন্তু এই আলোচনার মধ্যেই অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হইয়া গেল। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সহিত পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করিতে চাহিয়াছিল; কিন্তু ইরান তাহাতে সম্মত হয় নাই। বরং রাশিয়া ও চীনের সহিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করে। যদিও ইরান দাবি করিয়া আসিতেছে যে, তাহাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ; কিন্তু তাহা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিকট বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয় নাই। এখন উভয় দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করিবে, ইহা কোনো উন্মাদও বিশ্বাস করেন না। কেননা বিশ্বের শক্তিশালী দেশটির সামরিক শক্তির তুলনায় ইরান ধারেকাছেও নাই। অন্যদিকে গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে যে কোনো যুদ্ধের কোনো না কোনো নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র বিশ্বেই পড়িতে দেখা যায়। বিশেষ করিয়া, মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত হইয়া উঠিলে জ্বালানিসহ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বের সর্বত্র আছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য।
উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে আমরা যুদ্ধে বিবদমান উভয় পক্ষকে বলিব, যুদ্ধ বন্ধ করিয়া আবার আলাপ-আলোচনায় ফিরিয়া যাওয়াই হইবে বুদ্ধিমানের কাজ। কূটনৈতিক আলোচনা ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নহে। কেননা যুদ্ধের পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে টেরোরিজম বা সন্ত্রাসবাদ আবার নূতন করিয়া বাড়িয়া গেলে তাহাতে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। অতীতে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে যুদ্ধের ফল কীরূপ হইয়াছে তাহা কাহারো অজানা নহে। ইহাতে যুদ্ধাক্রান্ত দেশ ভাবিতে পারে, দেশে লক্ষ লক্ষ সৈন্য রাখিয়া লাভ কী? তাহারা ভাবিতে পারেন, অস্ত্রশস্ত্রে পারা যাইবে না। সেই সংগতি তাহাদের নাই। তাই তাহারা আবার চরমপন্থা বাছিয়া লইতে পারেন। একবার ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন, পৃথিবীর অন্য দেশসমূহ একই পন্থা অবলম্বন করিলে এই পৃথিবী কি আর বসবাসযোগ্য থাকিবে?
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 987 বার