আজ পবিত্র শবে বরাত

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

০৩ ফেব্রু ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ


আজ পবিত্র শবে বরাত

স্টাফ রিপোর্টার:
আজ মঙ্গলবার দিবসের আলোকরেখা পশ্চিমে মিলিয়ে যাওয়ার পরই শুরু হবে অনেক মুসলমানের কাছে পরম কাঙ্ক্ষিত মহিমাময় রজনি—শবে বরাত। পাপ থেকে সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিষ্কৃতি লাভের অপার সৌভাগ্যের রাত। শবে বরাত পালন নিয়ে আলেম-ওলামাদের মধ্যে দুস্তর মতভেদ বিদ্যমান। পালনের বিপক্ষের পাল্লা দিনে দিনে ভারী হচ্ছে। ইবনে মাজাহ ও বাইহাকীর একটি দুর্বল হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত আলি ইবনে আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন :আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো রিয্‌ক প্রার্থনাকারী, আমি রিয্‌ক দান করব। আছে কি কোনো বিপদে নিপতিত ব্যক্তি আমি তাকে সুস্থতা দান করব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে।

যদিও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আমাকে ডাকার কেউ আছে কি? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে তা প্রদান করব। আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব।’

বস্তুত উপমহাদেশের কিছু আলেম বলে থাকেন, শবে বরাত হলো আল্লাহ তায়ালার মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়। আল্লাহ সুবানাহু তায়ালার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। এই রাতে বিশেষ বরকত হাসিলের মানসে মুসলিম সম্প্রদায় নফল নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার, ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়ায় মশগুল থাকেন। শবে বরাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে অভিহিত করেছেন অনেকে। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত। আর বরায়াত শব্দের অর্থ হলো—নাজাত, নিষ্কৃতি বা মুক্তি। শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে পবিত্র শবে বরাত পালিত হয়। এ ব্যাপারে কুরআনুল করিমে সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকলেও একটি ‘হাসান’ হাদিসে এটাকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলা হয়েছে। বিজ্ঞ আলেম-উলামা ও ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এই রাতে বিশেষ কোনো ইবাদতের নির্দেশ নেই বলে মনে করেন। এর পক্ষকাল পরেই রহমত বরকত নাজাতের সওগাত নিয়ে আসবে মাহে রমজান। এ কারণে শবে বরাতকে বলা হয় রমজানের মুয়াজ্জিন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে শাবান মাসের একটি রজনিকে ‘শব-ই-বরাত’ বলা হয়। তুরস্ক, ইরান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দেশের কোনো কোনো এলাকায় শবে বরাত ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর কোথাও শবে বরাতের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই রাতে ইরানের সর্বত্র আলোক সাজসজ্জা করা হয় ও বিশেষ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

শবে বরাতকে যে সব আলেম সমর্থন করেন তাদের মতে, এ রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়া, দীর্ঘ সেজদা করা, দুই রাকআত করে যত ইচ্ছা নামাজ পড়া, কুরআনুল করিম তেলওয়াত করা, বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া, ইসেতগফার করা, দুআ করা, তাসবিহ তাহলিল, জিকির-আসকার করা আর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই নিজের জন্য, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী ও সব মুসলমানদের জন্য বেশি বেশি দোয়া, তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত। সম্ভব হলে পুরুষের জন্য কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করা, কবরবাসীদের জন্য দোয়া করাও সওয়াবের কাজ। এ রাতের নফল আমলসমূহ একাকীভাবে করণীয়।

শবে বরাতের ইতিহাস সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ৪০০ বছরের মধ্যে শবে বরাত বলে কিছু ছিল না। তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনে, এমনকি সাহাবিদের যুগেও এই ধরনের কোনো দিবস পালনের কথা ইসলামের ইতিহাসে নেই। ইবনে কাসিরের বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ত্বারতুসির হাওয়াদেস ও বিদ’আ এবং ইবনুল কাইয়ুমের আল-মানারুল মুনিফ ইতিহাস গ্রন্থে শবে বরাতের উদ্ভবের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘শবে বরাতের নামাজ ও এবাদতের প্রথম প্রচলন হয় হিজরি ৪৪৮ সনে। ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের ইবনে আবিল হামরা নামীয় একলোক বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন। তার তিলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি শাবানের মধ্যরাত্রিতে নামাজে দাঁড়ালে তার পেছনে এক লোক এসে দাঁড়ায়, তারপর তার সঙ্গে তৃতীয় জন এসে যোগ দেয়, তারপর চতুর্থ জন। তিনি নামাজ শেষ করার আগেই বিরাট একদল লোক এসে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী বছর এলে, তার সঙ্গে অনেকেই যোগ দেয় ও নামাজ আদায় করে। এতে করে মাসজিদুল আক্সাতে এ নামাজের প্রথা চালু হয়। কালক্রমে এ নামাজ এমনভাবে আদায় হতে লাগে যে অনেকেই তা সুন্নাত মনে করতে শুরু করে।’ পরবর্তী শাসকদের সময়ে এটা বন্ধ হয়ে গেলেও আবারও ইরান থেকে এই শবে বরাত পালনের রীতি আমাদের উপমহাদেশে নতুন বিস্তার লাভ করে। ফলে হকপন্থি আলেমরা এই শবে বরাতের বিশেষ ইবাদত-হালুয়া-রুটি ইত্যাদিকে বিদায়াত বলে অভিহিত করে আসছেন।

যথাযথ মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে আজ মঙ্গলবার পবিত্র শবে বরাত উদ্যাপিত হবে। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আসকারের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে আগামীকাল সরকারি ছুটি। সংবাদপত্রের অফিস আজ বন্ধ থাকবে। এ রাতের তাত্পর্য তুলে ধরে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

জাতির কল্যাণে প্রার্থনার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার
পবিত্র শবে বরাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা এবং মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার এক বাণীতে পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা এ আহ্বান জানান। পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে উল্লেখ করা হয়, পবিত্র শবে বরাত আমাদের জীবনে রহমত, মাগফেরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত আছে, এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদের বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। তাই এ রাতকে সৌভাগ্যময় রজনি হিসেবে বিশ্বাস করা হয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 995 বার