সিলেট-৫: জমিয়তের ‘গলার কাঁটা’ বিএনপির ‘বিদ্রোহী’, ‘ফুরফুরে মেজাজে’ খেলাফতের প্রার্থী

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

০২ ফেব্রু ২০২৬, ০৪:১৪ অপরাহ্ণ


সিলেট-৫: জমিয়তের ‘গলার কাঁটা’ বিএনপির ‘বিদ্রোহী’, ‘ফুরফুরে মেজাজে’ খেলাফতের প্রার্থী

স্টাফ রিপোর্টার:

সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। দলটি এখানে সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুককে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এখানে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির এক নেতা। মামুনুর রশীদ নামের ওই বিএনপি নেতাই এখন জমিয়ত প্রার্থীর ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

আসনটিতে মোট প্রার্থী চারজন। তাঁরা হলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুরগাছ প্রতীক), খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান (দেয়াল ঘড়ি প্রতীক), স্বতন্ত্র মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুন (ফুটবল প্রতীক) ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. বিলাল উদ্দিন (হারিকেন প্রতীক)।

মামুনুর রশীদ জেলা বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তিনি সম্প্রতি বহিষ্কৃত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন উবায়দুল্লাহ ফারুক। সেবার মামুনুর রশীদ বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও জোট রাজনীতির ভাগ-বাঁটোয়ারার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত উবায়দুল্লাহ ফারুক চূড়ান্ত মনোনয়ন পান। এবারও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে মামুনুর রশীদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।

অন্যদিকে আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন জেলার নায়েবে আমির আনওয়ার হোসাইন খান। তবে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এখানে খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।

জেলার রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের ধারণা, আসনটিতে উবায়দুল্লাহ, আবুল হাসান ও মামুনুরের মধ্যেই ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী স্থানীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়। বিএনপির একটা অংশ তাঁর সঙ্গে আছে। এ অবস্থায় উবায়দুল্লাহকে একটু চাপে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটভুক্ত শরিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকায় আবুল হাসান ‘ফুরফুরে মেজাজে’ আছেন।

স্থানীয় কয়েকজন বলেন, আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরীর (ফুলতলী হুজুর) তৈরি করা সংগঠন আনজুমানে আল ইসলাহের অনেক ভক্ত ও মুরিদ আছেন। ফুলতলী অনুসারীদের সিলেট-৫ আসনে একটা ভোটব্যাংক আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুলতলী হুজুরের ছেলে মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। তাই ফুলতলী অনুসারীদের ভোট এবার কার পক্ষে যাবে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ‘ভোটব্যাংক’ জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

১১-দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর সমর্থনে গঠিত সিলেট-৫ আসনের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও সংগঠনটির সিলেট জেলা শাখার সহসভাপতি মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, মাঠ আমাদের পক্ষে। সাধারণ মানুষ ভোট দিতে অপেক্ষায় আছেন। জামায়াতসহ অন্যান্য শরিক দলের নেতা-কর্মীরাও নিজেদের মতো করে আমাদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিজয় আসবেই।’

এদিকে স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মী বলেন, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের একটা বড় অংশ মামুনুর রশীদের সঙ্গে থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সঙ্গে থাকায় গত শনিবার জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনসহ (সেলিম) চারজন এবং কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সহসভাপতিসহ পাঁচজন বহিষ্কৃত হন। আরও কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হতে পারে বলে দলের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে দলের অনেক নেতা-কর্মী আছেন। শোনা যাচ্ছে, আরও কয়েকজন নেতা বহিষ্কৃত হবেন। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে দল থেকে তাদের বহিষ্কার না করার কৌশল অবলম্বন করা উচিত ছিল। এভাবে বহিষ্কার করায় এখন বহিষ্কৃতরা উঠেপড়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। এটা ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

তবে বিএনপির সিংহভাগ নেতা-কর্মী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীর পক্ষে আছেন বলে দাবি করেছেন উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি  বলেন, ‘মামুনুর রশীদের পক্ষে বিএনপির কিছু নেতা ছিলেন, তাঁরা বহিষ্কৃত হয়েছেন। বিএনপির আরও কয়েকজন তাঁর সঙ্গে আছেন। এর বাইরে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাসহ বড় অংশই আমার সঙ্গে আছেন। সাধারণ ভোটারেরাও আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী, ইনশা আল্লাহ।’

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ ভোটাররা আমাকে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছেন। সবার সমর্থন নিয়ে প্রার্থী হয়েছি। আমার জয় হবে ইনশা আল্লাহ।’

স্বাধীনতার পর আসনটিতে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি ও দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। এ ছাড়া বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।

এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন। এ ছাড়া পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন ৭ হাজার ৯১১ জন ভোটার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার