মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

২৯ জানু ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ


মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার:
গত ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর প্রথমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘যারা (জুলাই অভ্যুত্থানে) প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, সে জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে হাজারো সমর্থক স্বাগতম জানায়। দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও আবেগঘন করে তোলে। তিনি বলেন, মায়ের কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে বড় শিক্ষা, দায়িত্ব পেলে তা পালন করতে হবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ছাত্র–জনতার আন্দোলন, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক দমন–পীড়নের অভিযোগ- সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তার পর প্রথম বড় নির্বাচনী লড়াই এটি। এই নির্বাচনে বিএনপি বড় শক্তি হিসেবে মাঠে নামছে, আর তারেক রহমান কার্যত দলটির প্রধান মুখ।

তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারার উত্তরাধিকার বহন করেন, আবার নতুন প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেও গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে দায়িত্ব, ঐক্য ও রাজনৈতিক অধিকার শব্দগুলো।

এদিকে দেশের অর্থনীতি এখন নানা চাপে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। টাকার মান দুর্বল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে পড়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এ সংকট কাটানো কঠিন। তারেক রহমান এসব চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।

তারেক রহমান পরিবেশ, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- দেশজুড়ে খাল–নদী পুনরুদ্ধার করে পানির স্তর পুনর্গঠন, বছরে বিপুলসংখ্যক গাছ রোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা তৈরি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, কারিগরি শিক্ষায় জোর দিয়ে দক্ষকর্মী তৈরি এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব। তার ভাষ্য, পরিকল্পনার একটি অংশ বাস্তবায়ন করলেও দেশের অর্থনীতি ও জীবনমান দৃশ্যমানভাবে উন্নত হবে। আর আমি যদি আমার পরিকল্পনার ৩০ ভাগও বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবেন।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা- এসব বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে তারেক রহমান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করবো।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদীয় কাঠামোর পরিবর্তন, মেয়াদসীমা নির্ধারণ- এসব নিয়ে গণভোটের আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংস্কার কার্যকর হলে ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা রোধ করা সহজ হবে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা বিতর্কমুক্ত নয়। সমর্থকদের মতে, তিনি রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত; দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তিনি বংশগত সুবিধাভোগী নেতা, যার বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

বিভিন্ন মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ হয়েছিল, যা পরে বাতিল করা হয়েছে। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।

২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছিল—এই প্রসঙ্গও নতুন করে সামনে এসেছে। সংস্কারপন্থীদের আশঙ্কা, অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন পুনরায় না ফিরে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগে তারেক রহমান ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন।

কারাগারে থাকাকালে নির্যাতনে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা তৈরি হয়, যা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। মূলত চিকিৎসার লক্ষ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তারেক রহমান বলেন, ‘খুব বেশি শীত পড়লে আমার পিঠে ব্যথা বেড়ে যায়। তবে আমি একে জনগণের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।’

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 995 বার