সাজার নীতিমালা না থাকায় উচ্চ আদালতে টিকছে না অনেক ফাঁসির রায়
২৮ ফেব্রু ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:
রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় বিচারিক আদালত আট জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয় জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। গত বছরের মে মাসে হাইকোর্ট ১৪ আসামির মধ্যে নয় জনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামির সাজা কমিয়ে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন।
২০০৬ সালে জয়পুরহাট সদরের ধারকী গ্রামের আব্দুল মতিনকে কুপিয়ে হত্যা মামলায় সাত জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক আসামিকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ২০২২ সালে ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে এক আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখে হাইকোর্ট। বাকি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে হত্যা করা হয় শাহ আলী থানার এএসআই হুমায়ুন কবিরকে।
এই হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও এক জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০২৩ সালে ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে হাইকোর্ট দণ্ডিত সব আসামিকে খালাস দেয়।
আইন কমিশন বলছে, ফৌজদারি আইনে অপরাধের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করা রয়েছে। বিচারিক আদালতে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুনানির সুনির্দিষ্ট বিধান বা নীতিমালা নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ও ন্যায়সংগত সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করা সমীচীন। সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে উপযুক্ত সাজার পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে বিঘ্নিত হয় ন্যায়বিচার। জন-আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি। এ কারণে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে সাজা বিষয়ক আইন বা নীতিমালা প্রয়োজন।
কমিশন বলছে, সাধারণত ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালতের বিচারকরা সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে বিস্তৃত স্ববিবেচনা ক্ষমতা অর্থাত্ নিজ মেধা, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্ব তথা মাইন্ডসেট অনুসারে প্রদান করে থাকেন। ফলে আসামির সাজার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারকভেদে অসমতা ও অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হচ্ছে। যার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচারকি আদালত কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ডাদেশ আপিল আদালত কর্তৃক রদ বা রহিত অথবা পরিবর্তন হচ্ছে।
এদিকে আইন কমিশন থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৫৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি ডেথ রেফারেন্স নামঞ্জুর হয়েছে। অর্থাত্ ৬৬ দশমিক ৬৬ ভাগ মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে ১৯টি মামলায়।
এছাড়া ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ১৯টি ডেথ রেফারেন্স নামঞ্জুর করেছে হাইকোর্ট। অর্থাত্ ৮৬ দশমিক ৩৭ ভাগ মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হয়েছে। ১৯টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরিবর্তন হলেও ফাঁসি বহাল রাখা হয়েছে মাত্র তিনটি মামলায়। খুনের মামলায় বিচারিক আদালত যখন কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করে তা অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে মামলার সকল নথি পাঠানো হয়। যা ডেথ রেফারেন্স মামলা নামে পরিচিত।
কমিশন বলছে, উল্লিখিত পরিসংখ্যান থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, বিচারিক আদালতসমূহের প্রদত্ত দণ্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডেথ রেফারেন্স মামলায় বহাল থাকছে না। এই অসমতা ও অসামঞ্জস্যতা দূরীকরণের নিমিত্তে সাজার পরিমাণ নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে কমিশন একটা খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রেরণ করেছে।
সাজা পরিমাণ নির্ধারণ নিয়ে পৃথক শুনানির ব্যবস্থা রাখা প্রসঙ্গে ‘রাষ্ট্র বনাম লাভলু’ মামলায় হাইকোর্ট বলেছে, ধর্ষণ, খুন, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য না করে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামির শাস্তি কী হবে সেটা নির্ধারণে পৃথক শুনানির জন্য ব্যবস্থা রাখা দরকার। সেই শুনানিতে অপরাধীর বয়স, চরিত্র, ব্যক্তি বা সমাজের প্রতি সংঘটিত অপরাধের প্রভাব, অপরাধী অভ্যাসগত, সাধারণ নাকি পেশাদার, অপরাধীর ওপর শাস্তির প্রভাব, বিচার বিলম্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী বিচার চলায় কারাগারে আটক থাকায় অপরাধীর মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া। যাতে একজন অপরাধী নিজেকে সংশোধন ও সংস্কারের সুযোগ পান। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামিদের শাস্তির বিষয়ে রায় দেবেন বিচারক।
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় সাজা বিষয়ক নীতিমালা কতটা প্রয়োজন—তা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিল এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ইত্তেফাককে বলেন, আমি মনে করি এ সংক্রান্ত নীতিমালা বা বিধান আইনে থাকা দরকার। এটা না থাকলে অপরাধের সঙ্গে অপরাধীর যোগাযোগের মাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ হয় না। আইনে এই বিধান বা নীতিমালা না থাকায় একই অপরাধে অনেক সময় সম্পৃক্ততা কম এমন ব্যক্তিও সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করেন। ফলে নীতিমালা থাকলে একজন অপরাধীকে সঠিক ও ন্যায়সংগত সাজা প্রদান সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির বলেন, সাজার নীতিমালা থাকলে উপযুক্ত অপরাধের জন্য অভিযুক্তকে উপযুক্ত শাস্তি প্রয়োগ করা যেত। ফলে একজন বিচারক তার মনমত বিচার করার সুযোগ পেত না। নীতিমালা প্রণয়ন করলে বিচার ও আসামিকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্যও দূর হবে।
সাজার পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ক: শুনানি যেসব দেশে
ভারতে দায়রা ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কর্তৃক আসামিকে দণ্ড প্রদান সংক্রান্ত শুনানির বিধান রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও একই বিধান রয়েছে। ১৯৯৫ সালে কানাডায়, ২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডে এ সংক্রান্ত বিধান বিশদভাবে বর্ণিত করা হয়েছে। সিংগাপুরে ফৌজদারি কার্যবিধিতে সাজার পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ক শুনানির বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে ল’ রিফর্ম অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে এই বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পাঁচ বছর পর তা বাতিল করা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৭(৫) ধারায় সাজা প্রদানের কারণ ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই ধারা ব্যতীত অন্য কোনো ধারায় প্রদত্ত সাজার কারণ সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা নাই।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 997 বার