কাকলী ধর:
ইদানিং আমার স্কুলে এমন কিছু শিশু পাচ্ছি, যারা তাদের পছন্দের ব্লগার কিংবা কার্টুন চরিত্রের ভঙ্গিতে কথা বলে। শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। তারা যা দেখে, যা শোনে, যাদের পছন্দ করে—তারই কোনো না কোনো প্রতিফলন তাদের ভাষা, আচরণ ও অভ্যাসে দেখা যায়।
সমস্যাটা আসলে কোনো নির্দিষ্ট ব্লগার, কার্টুন কিংবা বিদেশি কনটেন্টে নয়। বরং বিশ্বায়নের এই সময়ে শিশুর হাতের মুঠোয় পৃথিবীর প্রায় সব ভাষা, সংস্কৃতি, উচ্চারণ ও জীবনযাপনের নানা রকম উপস্থাপনা চলে এসেছে। শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের পছন্দের বিষয়টি গ্রহণ করছে। কিন্তু সেই গ্রহণ করা ভাষা বা উচ্চারণ যখন তার চারপাশের মানুষের ভাষার সঙ্গে মেলে না, তখন তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত যোগাযোগ-দূরত্ব।
শিশুটি হয়তো তার নিজের কাছে একেবারেই স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। কিন্তু আমরা তার কথা বুঝতে পারছি না, কিংবা সে আমাদের কথা বুঝতে একটু সময় নিচ্ছে। ফলে তার প্রয়োজন, অভাব, অভিযোগ কিংবা অনুভূতিগুলোও প্রথম দিকে আমাদের কাছে অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে শিশুরা পরিবেশের ভাষা ও কথাবার্তার ধরন আয়ত্ত করে ফেলে।
স্কুলে বছর দুয়েক কাটানোর পর তাদের অনেকেই প্রমিত ও আঞ্চলিক দুই ধরনের ভাষাতেই বেশ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শেখে। কিন্তু সেই শুরুর সময়টুকুতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করাটা কখনো কখনো সত্যিই চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
তানিশ এমনই একটি শিশু। ভীষণ আদুরে, বিনয়ী এবং কৃতজ্ঞতাবোধসম্পন্ন। একদিন তার হাতে সামান্য একটু কেটে গিয়েছিল। আমি ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সামান্য এই যত্নটুকুর জন্য তার যে কী গভীর কৃতজ্ঞতা! সারাদিনে যতবারই দেখা হয়েছে, প্রতিবারই সে মিষ্টি করে বলেছে, ‘থ্যাংক ইউ।’
প্রথম দিকে তানিশের কথাবার্তাতেও ছিল এক ধরনের বিজাতীয় উচ্চারণ ও ভঙ্গি। এখন অবশ্য সে প্রমিত ও আঞ্চলিক। দুইভাবেই বেশ স্বাভাবিকভাবে কথা বলে। ক্লাসের ফাঁকে সে যেন গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছিল। কত গল্প তার! পড়াশোনার গল্প, ছবি আঁকার গল্প, বেড়াতে যাওয়ার গল্প। আর বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের গল্পও।
কথা বলতে বলতে একসময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, তুমি কি জানো, কখনো বাসায় বা বাইরে কোনো বিপদ হলে কোন নম্বরে ফোন করতে হয়?’ অবাক হয়ে দেখলাম, তথ্যটি তার জানা আছে। তবে সেটি বাংলাদেশের নয়, অন্য দেশের!
সে বলল, পুলিশকে ফোন করবে ৯১১-এ, আর অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ১০৮-এ। তাকে বোঝালাম, ‘আমাদের দেশে কিন্তু জরুরি সেবা পেতে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে হয়।’ সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না!
শেষ পর্যন্ত তাকে বোঝাতে হলো যে, তার জানা নম্বরগুলো হয়তো সে অন্য দেশের কোনো ভিডিও, গল্প কিংবা কার্টুন থেকে শিখেছে। আর বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯। এই নম্বরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স-সংক্রান্ত জরুরি সহায়তা পাওয়া যায়।
এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাকে আবারও ভাবালো। আমরা শিশুদের শুধু কী শেখাচ্ছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; তারা বাইরে থেকে কী শিখে আসছে, সেটিও আমাদের জানতে হবে।
একসময় মনে হতো, শিশুরা মা-বাবার কথা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। স্কুলে এলে আমরা দেখেছি, অনেক সময় মা-বাবার চেয়েও শিক্ষককে তারা বেশি বিশ্বাস করে। কিন্তু ডিজিটাল পৃথিবী এসে সেই সমীকরণটাও বদলে দিয়েছে।
এখন কোনো কোনো শিশুর কাছে পছন্দের ব্লগার, ইউটিউবের কোনো চরিত্র কিংবা কার্টুনের কোনো চরিত্রও হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘বিশ্বাসযোগ্য মানুষ’। তারা যা বলে, শিশুটি সেটিকেই সত্য ধরে নিতে পারে—সেটি তার নিজের দেশের তথ্য কি না, তার নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, কিংবা তার বাস্তব জীবনে আদৌ প্রযোজ্য কি না। তা না বুঝেই।
তাই শিশুদের ডিজিটাল জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই হয়তো সমাধান নয়। বরং তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তারা কী দেখে জানতে হবে, কেন দেখে তা বুঝতে হবে এবং শেখাতে হবে—ইন্টারনেটে দেখা সব তথ্য সত্য নয়, আর পৃথিবীর এক জায়গার নিয়ম অন্য জায়গায় একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশুর ভাষা বদলালে তাকে শুধরে দেওয়ার আগে তার উৎসটা বোঝা দরকার। কারণ শিশুটি হয়তো ভুল কিছু বলতে চাইছে না। সে শুধু তার দেখা পৃথিবীটাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। আর সেই পৃথিবীটি এখন শুধু আমাদের পাড়া, আমাদের শহর কিংবা আমাদের দেশ নয়; সেটি পুরো পৃথিবী। শিশুর হাতের মুঠোয় আজ সত্যিই পুরো বিশ্ব। আমাদের দায়িত্ব। সেই বিশ্বের ভিড়ে তাকে তার নিজের পৃথিবীটাকেও চিনিয়ে দেওয়া।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল খালিক
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
উপ-সম্পাদকঃ ফুজেল আহমদ
প্রকাশক কর্তৃক উত্তরা অফসেট প্রিন্টার্স কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও শরীফা বিবি হাউজ, মেওয়া থেকে প্রকাশিত।
বানিজ্যিক কার্যালয় : উত্তর বাজার মেইন রোড বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: dailyajkersylhet24@gmail.com মোবাইল: ০১৮১৯-৫৬৪৮৮১, ০১৭৩৮১১৬৫১২।
শাফিয়া শরীফা মিডিয়া বাড়ীর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান দৈনিক আজকের সিলেট, রেজি নং: সিল/১৫৩