বেখবর সীমান্ত, থামছে না চো*রা*চা*লা*ন

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

০৮ মার্চ ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ


বেখবর সীমান্ত, থামছে না চো*রা*চা*লা*ন

স্টাফ রিপোর্টার:

সিলেটের সীমান্তগুলো সবসময় কঠোর নজরদারিতে থাকলে সীমান্তের চোরাইপথ ব্যবহার করে অবাধে আসছে চোরাচালান। চোরাচালান করা পণ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে গাড়ি দিয়ে সিলেটে নিয়ে আসা হয়। কিছু কিছু চালান মজুদ করার পর পুলিশের কাছে ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালান সড়কে রফদফার পরপর তার গন্তব্যে চলে যায়। ঈদকে সামনে রেখে সিলেট সীমান্তে তাদের তৎপরতা শুরু করেছে চোরাচাকারবারিরা।বিশেষ করে ঈদের কাপড়, মসলা ও প্রসাধনসামগ্রী চোরাই পথে নিয়ে আসার পাশাপাশি ইয়াবা ও বিদেশী বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক নিয়ে আসছে কারবারিরা। প্রশ্ন উঠেছে সড়কে পুলিশের চেকপোস্ট, এলাকা ভিত্তিক পুলিশের নজরদারি আর সাজানোগোছানো তৎপরতার পর কিভাবে চোরাচালান পণ্য সিলেটে প্রবেশ করছে? এছাড়া সিলেট সীমান্ত দিয়ে জ্বালানী তেল পাচাররোধে এবার নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। নজরদারির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিজিবি (৪৮) সিলেট ব্যাটালিয়ন।জানা গেছে, চোরাইপথে নিয়ে আসা এসব পণ্য শুধু সিলেট নয়, দেশের বিভিন্ন বাজারেও যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একাধিক চালানও উদ্ধার করেছে বিজিবি ও পুলিশ। পুরোনো ব্যবসায়ীরাই চোরাই পথে ভারতীয় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত। লাইন নিয়ন্ত্রণ (সীমান্ত পার করা ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকে টাকা আদায়কারী) করছেন পুরাতন ও নতুনরা মিলেমিশে। সীমান্ত ও বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে প্রায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য বিভিন্ন কৌশলে সিলেটের বাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান হয়। এরমধ্যে মাদক ছাড়াও রয়েছে সিগারেট, গরু-মহিষ, চা পাতা, ওষুধসামগ্রী, প্রসাধনী, শাড়ি, লেহেঙ্গা, মোবাইল হ্যান্ডসেট, জিরা, কম্বল ইত্যাদি। সেই সাথে আসছে বিস্ফোরকও আসে। গত দুই মাসে সিলেট র‌্যাব-৯ পৃথক পৃথক অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকউদ্ধার করে সীমান্ত এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায়।এগুলো কারা নিয়ে আসছে কিভাবে আসছে তা আজও ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। রোজার মাস শুরুর পর ফলমূল, মসলা, ট্যাং ও মসলা জাতীয় পণ্য চোরাচালানে বেশি নজর দেন ব্যবসায়ীরা। গত কয়েকদিন ধরে ঈদকে সামনে রেখে পোশাকের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় বিভিন্ন ধরেন শাড়ি, ওড়না, থ্রি-পিস, ড্রেস, পাঞ্জাবি এবং প্রসাধনসামগ্রী চোরাই পথে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক চালান সিলেট নগরীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নেওয়া হয়েছে।পুলিশ সূত্র জানায়, সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হয় গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলা সীমান্ত এলাকার চোরাই পথে। জৈন্তাপুরের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার মধ্যে আলুবাগান, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, মিনাটিলা,  ডিবির হাওর, আসামপাড়া রিভার পিলার, ঘিলাতৈল, টিপরাখলা, করিমটিলা, ভিরতগোল, জালিয়াখলা, নয়াবাড়ি,  নুরুলের টিলা, জঙ্গীবিল, বাঘছড়া, রাবার বাগানসহ কয়েকটি এলাকা দিয়ে চোরাচালান হয়। এসব এলাকায় চোরাচালান থেকে বিভিন্ন বাহিনীর নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিছনাকান্দি, প্রতাপপুর, দমদমিয়া, পাথরকোয়ারি, শ্রীপুর সীমান্ত থেকে ৪৮ বিজিবি ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্যদ্রব্য উদ্ধার করে। এরমধ্যে জিরা, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, পেঁয়াজ ও অলিভ অয়েল ছিল। এর আগের দিন মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ ২৭০ কেজি ভারতীয় জিরা উদ্ধার করে।

এছাড়া শুক্রবার (৬ মার্চ) রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে ভারতীয় পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান আটক করে। পরে তল্লাশি চালিয়ে কাভার্ড ভ্যান থেকে ১১ বস্তা ভারতীয় শাড়ী, ১৪ বস্তা ভারতীয় ক্লোপ জি ক্রীম, ৮৮টি শিশুদের চশমা ও ৬০ প্যাকেট সুপার বেবী আইওয়ার চশমা এবং ৩০ প্যাকেট শিশুদের টনি বেবি চশমা জব্দ করে।

 

এসময় পুলিশ সাদিকুর রহমান (২১) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে। সে এয়ারপোর্ট থানাধীন মংলিরপাড় এলাকার খুরশেদের ছেলে। জব্দকৃত ভারতীয় পণ্যের বাজার মূল্য প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৬০ টাকা। বুধবার (৪ মার্চ) মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জালালাবাদ থানাধীন হাটখোলা ইউনিয়নের পাগইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে রিমন আহমেদকে (২৪) গ্রেফতার করে। এসময় পুলিশ রিমন আহমেদের বসতবাড়িতে থেকে ভারতীয় অবৈধ ২০ বস্তা পেঁয়াজ ও ৭ বস্তা চিনি উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা এসব পণ্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮৭ হাজার টাকা।

গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে কানাইঘাটের সুরাইঘাট ভারত সীমান্ত পিলার ১৩১৪/এমপি থেকে সাড়ে ৭ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে ধর্মপুর থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র‍্যাব পরিচালিত বিশেষ যৌথ অভিযানে ধর্মপুরে পলিথিনে মোড়ানো এবং গাছের ডালপালা দিয়ে ঢেকে রাখা অবস্থায় ১৪টি বিস্ফোরক পাওয়ার জেল এবং ১৪টি ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা ডেটোনেটর ব্যবহার করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইম্প্রভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) প্রস্তুত করা সম্ভব। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জ উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে রায়গ্রাম এলাকার যাত্রীছাউনির আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১৫টি পাওয়ার জেল ও ১৭টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়।

 

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে জকিগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারস্থ ‘রিল্যাক্স ক্যাফে’ নামক একটি রেস্টুরেন্ট থেকে  ১০ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাস ৩জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃরা হলো উপজেলার বারঠাকুরী ইউনিয়নের উত্তরকুল দিঘালীগ্রামের হারুছ মিয়ার ছেলে ছাবির আহমদ (২৪) ও শাকল আহমদ (২০) এবং কসকনকপুর ইউনিয়নের নিয়াগুল গ্রামের মঈন উদ্দিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম (৩০)।

 

শনিবার (৭ মার্চ) বিজিবি ৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যান্টে কর্ণেল মো. নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় বিজিবির পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শূন্যরেখা থেকে ৮ কিলোমিটার অভ্যন্তর পর্যন্ত এলাকা এবং বিভিন্ন স্থলবন্দর, এলসিপি (ল্যান্ড কাস্টমস পয়েন্ট) ও আইসিপি (ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট) এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সেই সাথে চোরাচালান রোধেও বিজিবির তৎপরতা অব্যাহত আছে। স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট, নদীপথ ও চিহ্নিত রুটগুলোতে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, জ্বালানি স্টেশন ও পরিবহন কার্যক্রম মনিটরিং এবং সন্দেহভাজন রুটে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে আকস্মিক তল্লাশি পরিচালনা করা হচ্ছে।

জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুবায়ের আনোয়ার বলেন, সীমান্তের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় বিজিবি সবসময় সতর্ক রয়েছে। সেই সাথে  মাদকদ্রব্য ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশ রোধ এবং অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান রোধে বিজিবির গোয়েন্দা তৎপরতা, আভিযানিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, মহানগরী এলাকায় পুলিশের কঠোর নজরদারি রয়েছে। চোরাচালান পণ্যের কোন খবর পাওয়ার সাথে সাথে অভিযান চালায় পুলিশ। ইতোমধ্যে পুলিশের বেশ কয়েকটি অভিযান চোরাচালান পণ্যসহ কারবারিদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 984 বার