প্যারোলে মুক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি
০৬ ফেব্রু ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:
কিংবদন্তি রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা তাহার একটি বিখ্যাত উক্তিতে বলিয়াছেন, ‘কারাগার বা বন্দিজীবন হইল ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের প্রয়োজনে একটি অসাধারণ শিক্ষা, যাহা একজন ব্যক্তির প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা।’ ইহার সরল ব্যাখ্যা হইল, একজন ব্যক্তি যখন কারারুদ্ধ হইয়া পড়েন, তখন তাহাকে বন্দি জীবনে কিছু প্রতিশ্রুতি পালনের মধ্য দিয়া যাইতে হয়। কারাগারের নিয়মকানুন যথাযথভাবে পালন করিবার পাশাপাশি ধরিয়া রাখিতে হয় আত্মসংযম। নিঃসন্দেহে এই কঠিন পরীক্ষায় অসীম ধৈর্য এবং কঠিন অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, আর সেই কারণেই কারাবন্দিদের প্রতি সর্বদা মানবিক আচরণ প্রদর্শনের কথা বলিয়া থাকে রাষ্ট্র। ইহা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি; অর্থাৎ, কারারুদ্ধ ব্যক্তিটি যেমন রাষ্ট্রকে কারানীতি মানিবার প্রতিশ্রুতি দিবেন, রাষ্ট্রের পক্ষ হইতেও তিনি সম্মানসূচক বিশেষ প্রতিশ্রুতি বা সুযোগ ভোগ করিবেন।তবে সুনির্ধারিত নিয়ম বা আইনের দ্বারা সুরক্ষিত এই ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ পলিসি দুঃখজনকভাবে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র বেমালুম ভুলিয়া যায় বা থোড়াই কেয়ার করে। বিশেষ করিয়া বলিতে হয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজবন্দিদের প্যারোলে জামিন মঞ্জুরসংক্রান্ত জটিলতার কথা। রাজনৈতিক বন্দিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্যারোলে জামিন পাইতেছেন না, যাহা লইয়া কয়েক দফা হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টিও হইয়াছে। কাগজে কলমে রাষ্ট্র যেই প্রতিশ্রুতির বয়ান দিয়া রাখিয়াছে, খোদ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিই উহার খেলাপ করিতেছে-ইহা কেমন কথা? আইন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই বিষয়ে গুরুতর আপত্তি জানাইয়া আসিতেছে। বন্দিদের পরিবারের আবেদন সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে তাহারা নাগরিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন বলিতেছেন।
সম্প্রতি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক এক ছাত্রনেতা তাহার মৃত স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সি শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের পক্ষ হইতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি পান নাই। ফলে কারাফটকে নেওয়া হয় স্বজনের মরদেহ। এই ঘটনার পর আইনজ্ঞরা কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার না বানাইবার আহ্বান জানাইয়াছিলেন। তবে ইহার রেশ কাটিতে না কাটিতেই কিশোরগঞ্জে অনুরূপ ঘটনায় প্যারোলে মুক্তি না মিলিবার কারণে বাবার মরদেহ আনিতে হইয়াছে কারাগারে। আপনজনের মৃত্যুতে যেইখানে প্যারোলে মুক্তির সুনির্ধারিত আইন বা নিয়ম রহিয়াছে, সেইখানে এই রকম হৃদয়বিদারক-অমানবিক ঘটনাগুলির পুনরাবৃত্তি কেবল দুঃখজনকই নহে, ইহার পাশাপাশি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাজনক।
প্যারোলে মুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। উক্ত নীতিমালায় বলা হইয়েছে, ভিআইপি বা অন্য সকল শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দিদের নিকটাত্মীয়ের-যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এবং আপন ভাইবোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাইবে। নীতিমালায় স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে যে, ইহা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হইলেও তাহা ইচ্ছামতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করিয়া প্রত্যাখ্যানযোগ্য নহে। অর্থাৎ, পরিবার কর্তৃক আবেদন জানানো সত্ত্বেও উক্ত বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। তাহা ছাড়া কারা ফটকে মাত্র মিনিট পাঁচেকের জন্য মৃত স্ত্রী বা সন্তান বা পিতামাতার মুখ দেখাইয়া একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ হইতে বঞ্চিত করিবার বিষয়টি চরম অমানবিকতার নামান্তর। এই সকল ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণ লইয়া গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হইতেছে। এই সকল নেতিবাচক দৃষ্টান্ত একটি সংবিধানস্বীকৃত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ।নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে একটি গুরুতর চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে; ইহাতে বলা হইয়াছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় হাজারো মানুষকে নির্বিচার আটক করিয়া রাখিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, বিচারহীন অবস্থায় আটক থাকা ঐ সকল ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হইতেছে। রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি এই তালিকায় রহিয়াছেন অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক। অর্থাৎ, অতীতে জাঁকিয়া বসা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটক এবং জামিন না মিলিবার ধারা বর্তমান সরকারের আমলেও অব্যাহত রহিয়াছে। এই ধারা চলিতে থাকিলে ‘পরিবর্তন’ কতটা অর্থবহ হইল, সেই প্রশ্ন যেমন উঠিবে, তেমনি রাষ্ট্র কর্তৃক অমানবিকতা প্রদর্শনের তালিকা আরো দীর্ঘ হইবে, যাহা কোনোভাবেই কাম্য নহে।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 991 বার