নগর ভবন থেকে সংসদের পথে ‘ডিপ্লোমেটিক লিডার’ আরিফ
১৩ ফেব্রু ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:
ছিলেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, এরপরে টানা দুবার নির্বাচিত হন সিটি মেয়র, আর এবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন আরিফুল হক চৌধুরী। ফলে নগর ভবন থেকে এখন সংসদের পথে এই বিএনপি নেতা।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফের রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান পতনে ভরপুর। রূপকথার গল্পের মতো।
সা্বেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান তাকে বলতেন ‘ডিপ্লোমেটিক লিডার’। সাইফুরের আস্থাভাজন হয়ে গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটের প্রভাবশালী রাজনীতিককে পরিণত হন আরিফ। এরপর দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকার নাম আসা, জেলা খাটা, সেখান থেকে ফিরে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়া, এরপর আরেক সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় জেলে যাওয়া, তারপর আবার মেয়র হওয়া, নিজে দলে কোনঠাসা হয়ে পড়া, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া- আরিফের রাজনৈতিক জীবন এমন নানা উত্থান-পতনে ভরপুর।
ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতি শুরু আরিফের। ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতিও। এখন দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্ঠা পদে আছেন। আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার (বর্তমান পদের নাম কাউন্সিলর) হিসেবে প্রথম জনপ্রতিনিধি হন। এরপর টানা দুইবার ছিলেন মেয়র। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি (সংসদ সদস্য) হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বেসরকারিভাবে আরিফুল হককে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। আরিফুল হক ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬টি ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের জয়নাল আবেদীন ৭১ হাজার ৩৯১ ভোট পেয়েছেন।
যোগাযোগ করলে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মানুষ যে বিপুল সমর্থন দিয়ে আমাকে এমপি নির্বাচিত করেছেন, এর ঋণ শোধ করার মতো কোনো ক্ষমতা আমার নেই। তবে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সুখে-দুঃখে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনের মানুষের পাশে আমৃত্যু থাকব। নির্বাচনী প্রচারণাকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেসব পূরণ করাই হবে আমার একমাত্র লক্ষ্য।’
সিলেট বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-১ (নগর ও সদর) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আরিফুল হক। তবে এ আসনে মনোনয়ন পান বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। এর আগে দলের উচ্চ পর্যায় থেকে সিলেট-১-এর পরিবর্তে বেশ কয়েকবার সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য বললেও তিনি রাজি হননি। গত ৫ নভেম্বর রাতে দলের হাইকমান্ড তাঁকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে নির্দেশনা দেন। পরে ৭ নভেম্বর থেকে তিনি নির্বাচনী এলাকায় প্রচার শুরু করেন। ৪ ডিসেম্বর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়।
আরিফুল হক বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য। এর আগে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং এমসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এবং তখনকার বিএনপি-দলীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে মূলত তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ২০০৩ সালে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই সঙ্গে তিনি তখন সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়টাতে প্রয়াত অর্থমন্ত্রীর সাইফুর রহমানের সিলেটকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরিফুল হকই দেখভাল করতেন। তাঁকে তখন অনেকে ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ হিসেবেও মনে করতেন।
আরিফুল ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়র হন। ২০১৮ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। একমাত্র সিলেটে বিএনপি থেকে আরিফুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সর্বশেষ ২০২৩ সালে বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তিনি প্রার্থী হননি।
বিএনপির মনোনয়নে আরিফুল টানা দুই মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নকাজের জন্য প্রশংসিত হন। সব মহলের কাছে তাঁর একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দলের আপত্তির কারণে অংশ নেননি।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 992 বার