দালালের প্রলোভনে কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে সন্তানদের অবৈধ পথে প্রবাসে পাঠান
৩১ মার্চ ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:
লিবিয়া থেকে গ্রিস ঝুঁকিপূর্ণ ‘গেমযাত্রার’ আগে শায়েক আহমদের (২৩) পরিবার দুই দফা দালালকে ১২ লাখ টাকা দিয়েছিল। টাকার জন্য দরিদ্র বাবা আখলুছ মিয়াকে গোয়ালের গরু, হাওরের জমি বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু শেষমেশ আর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি শায়েক। এর আগেই ভূমধ্যসাগরে প্রাণ গেছে তাঁর।
শায়েক আহমদের বাবা ও তাঁর স্বজনেরা বুকভাঙা কান্নার সঙ্গে একটি নাম বারবার মুখে নিচ্ছেন। সেটি হলো আজিজুল ইসলাম। এই আজিজুল ইসলামের মাধ্যমেই তাঁকে গ্রিসে পাঠাতে চেয়েছিল পরিবার। শায়েকের মতো একইভাবে মারা যাওয়া জগন্নাথপুর উপজেলার অন্য চারজনকেও গ্রিসে পাঠাতে লিবিয়ায় নিয়েছিলেন ‘দালাল’ আজিজুল। এসব পরিবারের সবাই এখন দালাল আজিজুলসহ অন্যদের বিচার চাইছেন।লিবিয়া থেকে ৩৮ জনকে নিয়ে রাবারের ওই বোটটি ২১ মার্চ গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করার পর ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে ফেলে। সাগরে বোটটি ছিল ছয় দিন। যে কারণে খাবারের সংকট দেখা দেয়। খাবার না পেয়ে দুর্বল হয়ে একে একে বোটের ১৮ জন মারা যান। দুই দিন লাশগুলো বোটে ছিল। একপর্যায়ে লাশে দুর্গন্ধ দেখা দিলে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন রয়েছেন। ২৭ মার্চ শুক্রবার গ্রিসের উপকূলে ওই বোটে থাকা অন্যদের উদ্ধারের পরই মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হয়।আখলুছ মিয়ার বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামে। আজিজুল ইসলামের বাড়ি একই ইউনিয়নের ইছগাঁও। তিনিও লিবিয়ায় আছেন বলে জানান এলাকাবাসী। ভূমধ্যসাগরে যে বোটে সুনামগঞ্জের ১২ জন মারা যান সেখান থেকে জীবিত ফেরা এক যুবক জানিয়েছেন, ওই বোটে দালাল আজিজুলের আটজন লোক ছিলেন। এর মধ্যে পাঁচজনই মারা গেছেন।রোববার দুপুরে আখছুল মিয়ার পরিবার ও সেখানে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এলাকার আরও তিনজন দালালের নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন পারাগাঁও গ্রামের শাহিন মিয়া, বালিকান্দির এনাম আহমদ ও ছিলাউরা গ্রামের করিম মিয়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এলাকায় এঁরা একটি চক্র গড়ে তুলেছেন। নানাভাবে যুবক-তরুণদের ইউরোপ নেওয়ার প্রলোভন দেখান। এরপর ওই তরুণ-যুবকেরা পরিবারে চাপ সৃষ্টি করেন। অনেকে ইচ্ছায়, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে সন্তানদের অবৈধ পথে প্রবাসে পাঠান। এতে অনেক পরিবার ধারদেনা করে। আবার অনেকে জমিজমা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন। একেকজনের জন্য ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা দিতে হয়।
একই ঘটনায় দিরাই উপজেলার মারা গেছেন ছয়জন। এর মধ্যে কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের তিনজন আছেন। তারাপাশা গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার জসিম উদ্দিন নামের এক দালালের মাধ্যমে তারাপাশা গ্রামের ওই লোকেরা লিবিয়া যান। জসিমের আবার স্থানীয় প্রতিনিধি আছেন কয়েকজন। কিন্তু লোকজন সেই নামগুলো বলতে নারাজ।তারাপাশা গ্রামের বাসিন্দা কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য এওর মিয়া বলেন, ‘গ্রামের মারা যাওয়া তিনজনই আমার আত্মীয়। এখন টাকাও গেল, মানুষও গেল। আমি অন্যরে দোষ দিই না। আমরাই তো দালালদের কাছে যাই।’ গ্রামের আরেক বাসিন্দা বলেন, দালালকে চুক্তির মোট টাকার অর্ধেক দিতে হয় আগে। বাকিটা ‘গেম’ প্রস্তুত হলে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফাহিম আহমদকে (২০) তাঁর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে গ্রিসে পাঠাতে চেয়েছিল পরিবার। কিন্তু সাগরে সেই বোটে ফাহিমও মারা যান। এই দালালের বিষয়ে পরিবারের কেউ মুখ খোলেননি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফাহিমের আপন মামা জামাল উদ্দিন লিবিয়া হয়ে গ্রিসে লোক পাঠান। জামাল উদ্দিনের আরেক ভাই আবদুর রহিম ওরফে জসিম উদ্দিন লিবিয়াতে আছেন। এ দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জে মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফাহিমের সঙ্গে এলাকার এবারও আরও কয়েকজনকে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের একজনের পরিবার ১৪ লাখ টাকা দিয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য জামাল উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন ধরেননি। ফাহিমের চাচা তাইজুল ইসলাম সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে বলছিলেন, ‘আমরা আসলে এভাবে অবৈধভাবে ফাহিমকে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে ছিলাম না।’ এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
স্থানীয় বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খান বলেন, উন্নত জীবনের আশায় মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে এলাকার অনেকেই অবৈধ পথে ইউরোপে যাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় ইউএনওরা দালালদের তালিকা করে সেটি পুলিশকে দিয়েছেন। সব উপজেলাতেই খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে আছেন তাঁরা। যাঁদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, তাঁদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, চিন্তাভাবনা চলছে।
সুনামগঞ্জের সব উপজেলা থেকেই কমবেশি একই প্রক্রিয়ায় অবৈধভাবে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে লোকজন যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনা ঘটলেই কথা বলি। কিছুদিন গেলে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এর মধ্যে জগন্নাথপুর, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, দোয়ারাবাজার উপজেলায় বেশি। দালাল চক্র জেলাজুড়েই সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন সোমবার দুপুরে বলেছেন, পুলিশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং গোপন তথ্যের মাধ্যমে দালালদের তালিকা তৈরি করছে। জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় এঁদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ যদি মামলা না করেন তাহলে পুলিশই বাদী মামলা করবে। আজ-কালের মধ্যেই মামলা হবে।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 988 বার