স্টাফ রিপোর্টার:
কঠোর হচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার নিয়ম কানুনে। দীর্ঘদিনের প্রশ্নপত্র ফাঁস, নকল ও জালিয়াতির দুষু্বচক্র ভাঙতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়ায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্ন ছড়ানো, গোপন তথ্য পাচার এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকলের মতো অপরাধগুলোও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুনর্গঠিত এই আইনের খসড়া গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভা কিছু সংশোধনী দিয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে আবার উত্থাপনের পর এটি সংসদে উত্থাপন করে চলতি অধিবেশনেই পাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার বিস্তার যখন পাবলিক পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তখন সময়োপযোগী ও কঠোর আইনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা।
নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, নকলের সহায়তা করলেও শাস্তির বিধান থাকছে। নকলে জড়িত থাকলে শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও শাস্তির আওতায় আসবেন। এছাড়া বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, দ্রুত বিচার এবং ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে আইনের খসড়ায়। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং সংঘবদ্ধ চক্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের বিধান রাখা হয়েছে। পরীক্ষার হলকে আরো নিরাপদ রাখতে প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে খসড়ায়।
এদিকে হঠাত্ করে পরীক্ষায় ‘অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম’ বাতিলের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ ও পঞ্চগড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। গত ৮ এপ্রিল বেলা ১১টায় শাহবাগে কিছু শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। একই দিন দুপুরে পরীক্ষায় অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম ও অপ্রয়োজনীয় আইন প্রত্যাহারসহ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে পঞ্চগড়ে হঠাত্ বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে একদল শিক্ষার্থী। ‘এসএসসি ২০২৬-২৭ ব্যাচ’ ব্যানারে পঞ্চগড় জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কের এক পাশে এই বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশ পরীক্ষার্থী অভিযোগ তুলেছে, নবনির্বাচিত শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষায় কঠোর নিয়ম আরোপ করেছেন, যা তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ও মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসএসসি পরীক্ষার মাত্র আড়াই থেকে তিন মাস আগে হঠাত্ করে এমন কঠোর নীতিমালা কার্যকর করায় তারা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিপাকে পড়েছে। অনেকেই বলেছে, এই পরিবর্তন যদি এক বছর পর থেকে কার্যকর করা হতো, তাহলে তারা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেত।
শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এখন নকল ও প্রশ্নফাঁসের ধরন বদলে গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে এসব অপরাধ বেশি হচ্ছে। তাই নতুন আইনে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা, জালিয়াতি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা বন্ধের লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরোনো আইনের দুর্বলতার সুযোগে অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে পার পেয়ে যাওয়ায় কঠোর আইন এখন সময়ের দাবি। নতুন আইন প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘নতুন আইনটি যদি প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বড় পরিবর্তন আসবে।’ তিনি বলেন, ‘কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।’ জানা গেছে, ১৯৮০ সালের আইন এবং ১৯৯২ সালের এর আংশিক সংশোধন বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের দাবি ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে নতুন ধরনের অপরাধ সৃষ্টি হলেও পুরোনো আইনে সেগুলোর যথাযথ প্রতিকার ছিল না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০০টি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৫টি, আর দণ্ড হয়েছে মাত্র একটিতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তের দুর্বলতা, ভুল আইনে মামলা ও সাক্ষ্য প্রমাণের ঘাটতির কারণে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
আগামী ২১ এপ্রিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং পর্যবেক্ষক ছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে অন্য কোনো ব্যক্তি অবস্থান করতে পারবেন না। এছাড়া পরীক্ষা শুরুর পরপরই কেন্দ্রের টয়লেটগুলো তল্লাশি এবং কোনো ধরনের নকলের সামগ্রী পাওয়া গেলে তা ফেলে দিতে হবে। অতিরঞ্জিত নয়, শিক্ষার্থীরা যা লিখবে তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব পরীক্ষাকেন্দ্রে বসবে সিসি ক্যামেরা, কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হবে। আগামী এইচএসসি পরীক্ষা থেকে সব বোর্ডেই অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার আগেই প্রতিটি বোর্ডে সরেজমিনে যাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি তিন শিক্ষা বোর্ড পরিদর্শন করেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল খালিক
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
উপ-সম্পাদকঃ ফুজেল আহমদ
প্রকাশক কর্তৃক উত্তরা অফসেট প্রিন্টার্স কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার, সিলেট থেকে মুদ্রিত ও শরীফা বিবি হাউজ, মেওয়া থেকে প্রকাশিত।
বানিজ্যিক কার্যালয় : উত্তর বাজার মেইন রোড বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: dailyajkersylhet24@gmail.com মোবাইল: ০১৮১৯-৫৬৪৮৮১, ০১৭৩৮১১৬৫১২।
শাফিয়া শরীফা মিডিয়া বাড়ীর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান দৈনিক আজকের সিলেট, রেজি নং: সিল/১৫৩