এক বছরে কেন দুটি সংসদ নির্বাচন হয়েছিল

Daily Ajker Sylhet

দৈনিক আজকের সিলেট

০২ ফেব্রু ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ণ


এক বছরে কেন দুটি সংসদ নির্বাচন হয়েছিল

স্টাফ রিপোর্টার:

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। এই নির্বাচন নিয়ে লিখতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে দুই বছর আগে, ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ। যেদিন হয়েছিল মাগুরার উপনির্বাচন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি তখন ক্ষমতায়। মাগুরা-২ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এই আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যু হলে উপনির্বাচন দিতে হয়। সেই নির্বাচন ঘিরে অসংখ্য নাটকীয় ঘটনার পরে বিরোধী দলগুলো একযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। যার ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচন।

মাগুরা উপনির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত ইত্তেফাক–এর প্রতিবেদন
মাগুরা উপনির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত ইত্তেফাক–এর প্রতিবেদনসূত্র : সংগ্রামের নোটবুক

মাগুরা উপনির্বাচন দিয়েই শুরু

মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে যেভাবে নির্বাচনী প্রচার চলেছিল, তা দেশের ইতিহাসে বিরল। সরকারি ও বিরোধী দলের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন না, যাঁরা সেখানে যাননি। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জনসভা করেছেন, বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাও দলবল নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন। হঠাৎ করে এই উপনির্বাচন অতটা গুরুত্ব কেন পেয়েছিল, তারও একটি কারণ আছে। একই বছরের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চারটি সিটি মেয়র নির্বাচন। নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে জিতেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং রাজশাহী ও খুলনার মেয়র হয়েছিলেন বিএনপির দুজন। তারপরও ফলাফল ড্র বলা যাবে না। কেননা গুরুত্বের বিচারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এগিয়ে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন বিএনপির দেখানোর দরকার ছিল যে তাদের জনপ্রিয়তা কমেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ছিল সরকারি দলের জনপ্রিয়তা কমেছে, তা প্রমাণের। ফলে সব আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে মাগুরার উপনির্বাচন।

কিন্তু মাগুরা উপনির্বাচন ঘিরে যখন একের পর এক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছিল, তখন বার্তাকক্ষের উত্তাপ পেতেই হয়েছে। বিশেষ করে ১৯ মার্চ রাতে যখন সে সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি আবদুর রউফ ফিরে এলেন, সেটি ছিল ওই দিনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

নির্বাচনে জিতেছিলেন বিএনপি প্রার্থী কাজী সলিমুল হক। আওয়ামী লীগ ব্যাপক সন্ত্রাস ও কারচুপির অভিযোগ তোলে। নির্বাচনের দিন সকালে সিইসি বিচারপতি আবদুর রউফ মাগুরা গিয়েছিলেন ভোট পর্যবেক্ষণ করতে। কথা ছিল ভোটের দিন থাকবেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে ১৯ তারিখ, নির্বাচনের আগের রাতেই ঢাকায় ফিরে আসেন। তাঁর সেই রহস্যময় ফিরে আসা নির্বাচন নিয়ে জল্পনাকল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফিরে এসে তিনি কেবল বলেছিলেন, ‘দেখলাম সেখানে মন্ত্রী আছেন, বিরোধী দলের নেত্রী আছেন, এক শর বেশি এমপি আছেন, তাই আমি আর থাকার প্রয়োজন বোধ করিনি, তাই চলে এসেছি।’ (২১ মার্চ, আজকের কাগজ)।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন

ঘটনার পর নির্বাচন বাতিলের দাবি তোলা হয়। বাকি সময়ে বিরোধীরা বিএনপি সরকারের অধীন আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচনের পরপরই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী—এই তিন দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলে। এই দাবিতে মিছিল, ঘেরাও, সংঘর্ষ, হরতাল ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। ৬ নভেম্বর বিরোধী দলের সবাই একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। আর ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও এনডিপির ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টির পক্ষে মিজানুর রহমান চৌধুরী, জামায়াতের পক্ষে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং এনডিপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পদত্যাগপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিতি দেখিয়ে ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই সংসদীয় আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করেন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী।

একই বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিব ইমেকা এনিওকু। তিনি রাজনৈতিক মধ্যস্থতার জন্য পাঠান তাঁর বিশেষ দূত, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর স্যার নিনিয়ান মার্টিন স্টিফেনকে। স্যার নিনিয়ান ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ চালালেও তাতে কার্যকর কোনো ফল হয়নি। বহুল আলোচিত সেই সংলাপও ভেঙে যায়। তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান ২১ নভেম্বর।

আন্দোলন ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে গেলে ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর পঞ্চম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 1K বার