আ.লীগ থেকে যেভাবে বিএনপির দুর্গ সিলেট-২
১৫ ফেব্রু ২০২৬, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেট-২ আসন। ইতিহাস ঐতিহ্যসহ রাজনৈতিক নানান বিষয় নিয়ে এই আসনটির রয়েছে আলোচনায়। ২৩০নং সংসদীয় আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম.ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর থেকে এই আসন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ হয়। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনে বিএনপির দুর্গ হিসাবে গড়ে তুলেন এম. ইলিয়াস আলী।তিনি বিশ্বনাথ উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের রামধানা গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৯৬ সালে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ) আসনে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এম. এম.ইলিয়াস আলী। একই বছর ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সিলেট-২ আসন দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহ আজিজুর রহমান। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের খুজগীপুর গ্রামে।২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের এমপি নির্বাচিত হন এম.ইলিয়াস আলী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির দখলে থাকা এই আসনে সু-সংগঠিত হলেও ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৩ হাজার ১শ’ ১৬ ভোট বেশি পেয়ে আসনটি চলে যায় আবারও আওয়ামী লীগের হাতে। এমপি নির্বাচিত হন শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা।ওই নির্বাচনে শফিকুর রহমান চৌধুরী ১ লক্ষ ৯ হাজার ৩৫৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী এবং এম. ইলিয়াস আলী ১ লক্ষ ৬ হাজার ৪০ ভোট পেয়ে পরাজিত হলেও ইলিয়াস আলী উন্নয়ন কর্মকন্ডে ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সেই সময় এম. ইলিয়াস আলী ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত সংগঠক। তাই সারাদেশেই এম. ইলিয়াস আলীর জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায়। তার জনপ্রিয়তাকে নির্মুল করতে ও বিএনপির দুর্গ ভাঙ্গতে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানী থেকে গুম করা হয় সাবেক সংসদ সদস্য তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক আনসার আলীকে।
এম. ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবীতে সারাদেশে আন্দোলন হলে সেই আন্দেলন দমাতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি নিহত ও আহত হন অনেকেই। পুলিশের করা মামলায় আন্দোলনে থাকা অনেক নেতাকর্মী হয়েছেন আসামী। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। নির্বাচনের বৈধতা দিতে বিরোধী দল করা হয় জাতীয় পার্টিকে। আর জাতীয় পার্টির সংখ্যাগষ্টিতা দিতে সিলেট-২ আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ফাঁকা মাঠে এমপি নির্বাচিত হন ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া।
তিনি বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস ইউনিয়নের দেওকলস গ্রামের বাসিন্দা। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের গোপন সমর্থন এবং মাত্র একজন প্রতিদ্ধন্দি হওয়ায় সহজেই বিজয়ী হন তিনি। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি পুনুরুদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন এম. ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়াকে দলীয় মনোনয়ন দিলেও আওয়ামী লীগের সাজানো নির্বাচনে আইনী জালে আটকে যায় তার মনোনয়ন। প্রার্থী না থাকায় বিএনপির গোপন সর্মথন ও জোটগত কারণে ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়ার মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গনফোরামের প্রার্থী মোকাব্বির খান। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও মাত্র একজন প্রার্থীর সাথে বিএনপির সমর্থনে জয়লাভ করে সংসদ সদস্যর তালিকায় নাম লিখান তিনি।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধিনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে না, এই অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। সেই নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্য মোকাব্বির খাঁন ও এহিয়া চৌধুরী ইয়াহিয়াসহ ৫ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। পুনরায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফিকুর রহমান চৌধুরী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দেলনে আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে গেলে শফিকুর রহমান চৌধুরী গোপনে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনগুন বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হত নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মীনী তাহসিনা রুশদী লুনা। প্রায় ২০ বছর পর স্বামীর আসন আবারও দখলে নিলেন তিনি। ধানের শীষের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর পেয়েছেন ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী ১১-দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট। ১৩ বছর ধরে তিনি সিলেট-২ আসনে রাজনৈতিকভাবে তৎপরতা ও স্বামীর নির্বাচনী এলাকায় রাজনীতিতে সক্রিয়তায় সিলেট- ২আসনে বিএনপির বিশাল ব্যবধানের জয় আবারও এই আসনকে আলোচনায় এনেছে।
এম. ইলিয়াস আলীকে মনে ধারণ করে বিএনপি এখানে দীর্ঘকাল ধরে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, যা প্রতিটি নির্বাচনে ভোটের অংকে বড় প্রভাব ফেলেছে। ২০১৭ সালে ওসমানীনগর উপজেলার নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিতি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিজয়ী হন।
সব মিলিয়ে এম.ইলিয়াস আলীর আসনে বিএনপি যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে তাহসিনা রুশদীর বিশাল বিজয় আবারো তা প্রমান করেছে।
এই সংবাদটি পড়া হয়েছে : 987 বার